ইয়াছিন আরাফাত, লক্ষ্মীপুর জেলা, প্রতিনিধি
চন্দ্রগঞ্জে তিন দিন পর পুকুরে মিলল শিশু লুবনার মরদেহ, দারিদ্র্যের কারণে কি চাপা পড়ে যাবে মৃত্যুর রহস্য?
নিজস্ব প্রতিনিধি, লক্ষ্মীপুর।
তিন দিন ধরে নিখোঁজ ছিল ছয় বছরের শিশু লুবনা আক্তার। পরিবারের সদস্যরা একদিকে সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আশায় পথ চেয়ে ছিলেন, অন্যদিকে স্থানীয়ভাবে চলছিল খোঁজাখুঁজি। অবশেষে বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) বিকেলে বাড়ির পাশের একটি পুকুর থেকে উদ্ধার হলো লুবনার মরদেহ।
কিন্তু সন্তানকে হারানোর শোকের সঙ্গে এখন নতুন প্রশ্ন সামনে এসেছে—লুবনার মৃত্যু কীভাবে হলো? নিছক পানিতে ডুবে মৃত্যু, নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো ঘটনা?
লুবনা আক্তার লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জ থানার পশ্চিম লতিফপুর গ্রামের সর্দার বাড়ির মো. লিটনের মেয়ে। গত সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বাড়ির সামনে থেকে নিখোঁজ হয় শিশুটি। এরপর স্বজনরা আশপাশের বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেও তার সন্ধান পাননি।
তিন দিন পর বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টার দিকে বাড়ির পাশের একটি পুকুরে বাবা ও নানা শিশুটির মরদেহ দেখতে পান। খবর পেয়ে স্বজন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করেন।
মরদেহ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। সন্তানের ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকা পরিবারটির ঘর মুহূর্তেই পরিণত হয় আহাজারির স্থানে। যে শিশুকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আশায় তিন দিন ধরে অপেক্ষা করছিল পরিবার, শেষ পর্যন্ত তাকে ফিরতে হলো নিথর দেহ হয়ে।
এখন সবচেয়ে জরুরি—লুবনার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী?
বাড়ির কাছের পুকুরে শিশুটির মরদেহ পাওয়া গেলেও শুধু এ তথ্যের ভিত্তিতে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। শিশুটি কীভাবে পুকুরে গেল, কখন সেখানে পৌঁছাল, পানিতে পড়ে তার মৃত্যু হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের বিষয়।
একই সঙ্গে গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন, নিখোঁজ হওয়ার পর তিন দিন ধরে শিশুটির কোনো সন্ধান কেন পাওয়া গেল না এবং বাড়ির পাশের পুকুরেই কীভাবে তার মরদেহ পাওয়া গেল।
শিশুটির শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল কি না, মৃত্যুর সময় কখন, পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে কি না এবং মৃত্যুর আগে অন্য কোনো ঘটনা ঘটেছিল কি না—এসব প্রশ্নের বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই প্রয়োজন। ময়নাতদন্ত ও তদন্তের ফলাফলই এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে।
পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা যেন তদন্তের পথে বাধা না হয়
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা এখানেই—পরিবারটি আর্থিকভাবে অসচ্ছল হলে কি লুবনার মৃত্যুর রহস্য যথাযথ তদন্ত ছাড়াই একসময় হারিয়ে যাবে?
একটি শিশুর মৃত্যুর তদন্তে পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা কোনোভাবেই বিবেচ্য হওয়া উচিত নয়। লুবনা কোনো বিত্তশালী পরিবারের সন্তান না হলেও তার মৃত্যুর কারণ জানার অধিকার তার পরিবারের রয়েছে। প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
স্থানীয়দেরও দাবি, ঘটনাটিকে সাধারণ দুর্ঘটনা ধরে নিয়ে যেন তদন্ত থামিয়ে দেওয়া না হয়। বরং নিখোঁজ হওয়ার সময় থেকে মরদেহ উদ্ধারের আগ পর্যন্ত পুরো ঘটনাপ্রবাহ খতিয়ে দেখে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত করা হোক।
লুবনার পরিবার হয়তো হারিয়েছে তাদের সবচেয়ে আপন মানুষটিকে। এখন তাদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কীভাবে মারা গেল তাদের ছয় বছরের সন্তান?
এই প্রশ্নের উত্তর যেন অর্থের অভাবে, প্রভাবের কাছে কিংবা সময়ের স্রোতে হারিয়ে না যায়—এটাই এখন পরিবারের প্রত্যাশা।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনেই পরিষ্কার হতে পারে লুবনার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ। কেউ দায়ী হয়ে থাকলে প্রমাণের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এবং দুর্ঘটনা হলে তার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করাও জরুরি।
লুবনার মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের শোক নয়; এটি একটি শিশুর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের প্রশ্ন। তাই আর্থিক অসচ্ছল এই পরিবারের কণ্ঠ যেন তদন্তের ভিড়ে হারিয়ে না যায়—দাবি উঠেছে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের।